নিরাপত্তার প্রশ্ন তুলে মাস্কের সংস্থাকে লাইসেন্স না দেওয়ার আর্জি স্বদেশি জাগরণ মঞ্চের, ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণ নিয়েও উদ্বেগ

দাঙ্গা, সন্ত্রাসবাদী হামলা বা অন্য কোনও আইনশৃঙ্খলাজনিত পরিস্থিতিতে ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ বা সীমিত করার প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু ইলন মাস্কের সংস্থা স্টারলিঙ্কের উপগ্রহভিত্তিক ইন্টারনেট সেই নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনা কতটা সম্ভব? এই প্রশ্ন তুলে ভারতে স্টারলিঙ্ককে বাণিজ্যিক পরিষেবা চালুর লাইসেন্স না দেওয়ার দাবি জানাল স্বদেশি জাগরণ মঞ্চ। মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর, রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) অর্থনৈতিক শাখা হিসেবে পরিচিত সংগঠনটি কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে এই আর্জি জানিয়েছে।

এক বিবৃতিতে সংগঠনটির জাতীয় সহ-আহ্বায়ক অশ্বিনী মহাজন বলেন, দাঙ্গা বা সন্ত্রাসবাদী ঘটনার সময় সামাজিক মাধ্যমে গুজব ও উসকানিমূলক বার্তার প্রচার রুখতে কখনও কখনও নির্দিষ্ট এলাকায় ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ রাখতে হয়। স্টারলিঙ্কের প্রযুক্তির ক্ষেত্রে সরকারি নির্দেশে একই ভাবে পরিষেবা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে সংগঠনটি।

উদ্বেগের কেন্দ্রে রয়েছে স্টারলিঙ্কের উপগ্রহগুলির মধ্যে লেজার সংযোগ প্রযুক্তি। এর মাধ্যমে তথ্য মাটিতে অবস্থিত কোনও কেন্দ্রের মধ্য দিয়ে না গিয়েও এক উপগ্রহ থেকে অন্য উপগ্রহে পৌঁছতে পারে। স্বদেশি জাগরণ মঞ্চের দাবি, ভারতের অভ্যন্তরে ইন্টারনেটের তথ্য আদানপ্রদান দেশের মাটিতে অবস্থিত গেটওয়ের মাধ্যমেই হচ্ছে, তা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় বিদেশি পরিকাঠামোর মাধ্যমে তথ্য আদানপ্রদান হলে আইনানুগ নজরদারি ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত তদন্তে সমস্যা দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা তাদের।

সীমান্তে নজরদারি নিয়েও উদ্বেগ

স্টারলিঙ্কের পরিষেবা শত্রুপক্ষ, চোরাচালানকারী বা বিদ্রোহী গোষ্ঠীর যোগাযোগের মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেছে সংগঠনটি। তাদের বিবৃতিতে দাবি করা হয়েছে, প্রচলিত টেলিকম নেটওয়ার্কের বাইরে যোগাযোগের জন্য উপগ্রহভিত্তিক ইন্টারনেট ব্যবহার করা হতে পারে। সংবেদনশীল সীমান্ত ও সংঘাতপ্রবণ এলাকার কাছে অনুমোদনহীন টার্মিনাল সক্রিয় থাকার অভিযোগও তুলেছে তারা। নিরাপত্তা সংস্থাগুলির বিভিন্ন তদন্তে স্টারলিঙ্কের সরঞ্জাম উদ্ধার হওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে বিবৃতিতে।

উপগ্রহভিত্তিক ইন্টারনেটের কৌশলগত গুরুত্ব বোঝাতে ইউক্রেন, ইরান, রাশিয়া, চিন ও তাইওয়ানের প্রসঙ্গও এনেছে স্বদেশি জাগরণ মঞ্চ। তাদের বক্তব্য, এই প্রযুক্তি শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, জাতীয় নিরাপত্তা ও ভূকৌশলগত স্বার্থের সঙ্গেও জড়িত।

দেশীয় পরিকাঠামোয় আস্থা

স্টারলিঙ্কের বিকল্প হিসেবে ভারতের বিদ্যমান মোবাইল ও ব্রডব্যান্ড পরিকাঠামোর পক্ষে সওয়াল করেছে সংগঠনটি। তাদের দাবি, দেশের টেলিকম নেটওয়ার্ক তুলনামূলক সাশ্রয়ী মূল্যে পরিষেবা দেয়। প্রয়োজনে সরকারি নির্দেশে নির্দিষ্ট এলাকায় পরিষেবা নিয়ন্ত্রণ করাও সম্ভব। পাশাপাশি টেলিকম সংস্থাগুলির সঙ্গে নিরাপত্তা সংস্থাগুলির সহযোগিতার বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে।

দেশের মহাকাশ গবেষণার অগ্রগতির প্রসঙ্গ টেনে পিএসএলভি ও চন্দ্রযানের পাশাপাশি গগনযান, নিসার এবং চন্দ্রযান-৪-এর মতো কর্মসূচির উল্লেখ করেছে স্বদেশি জাগরণ মঞ্চ। সংগঠনটির মতে, দেশীয় প্রযুক্তির সাহায্যে ভবিষ্যতে প্রত্যন্ত এলাকাগুলিতেও সাশ্রয়ী উপগ্রহভিত্তিক ইন্টারনেট পরিষেবা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হতে পারে।

বাণিজ্যেও পাল্টা পদক্ষেপের বার্তা

স্টারলিঙ্কের লাইসেন্সের প্রশ্নকে শুধু প্রযুক্তি বা টেলিযোগাযোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেনি সংগঠনটি। বিষয়টিকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও ভারতের নীতিগত স্বাধীনতার সঙ্গেও যুক্ত করেছে তারা। স্বদেশি জাগরণ মঞ্চের যুক্তি, অন্য দেশগুলি যেমন ভারতীয় রফতানির উপর বাণিজ্যিক বিধিনিষেধ আরোপ করে, তেমনই জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে ভারতও বিদেশি সংস্থার কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।

সব মিলিয়ে, নিরাপত্তা সংক্রান্ত শর্ত পূরণ না হলে স্টারলিঙ্ককে ভারতে বাণিজ্যিক পরিষেবা চালুর অনুমতি না দেওয়ার পক্ষেই সওয়াল করেছে সংগঠনটি। তবে স্বদেশি জাগরণ মঞ্চের এই দাবি সরকারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়। স্টারলিঙ্কের লাইসেন্স নিয়ে কেন্দ্র কী অবস্থান নেয়, এখন নজর সেদিকেই।